পারভেজ আহমদ :::সিলেট নগরীর ব্যস্ত সড়কগুলো যেন দিন দিন সাধারণ মানুষের চলাচলের পথ না হয়ে গুটিকয়েক পরিবহন চাঁদাবাজ ও অবৈধ লেগুনা সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে এমন অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। বৈধ কাগজপত্র, ফিটনেস, রুট পারমিট কিংবা লাইসেন্স ছাড়াই শত শত লেগুনা প্রতিদিন নগরীর প্রধান প্রধান সড়কে অবাধে চলাচল করছে। অথচ বৈধ পরিবহন মালিকদের সামান্য ত্রুটি পেলেই মামলা, জরিমানা কিংবা গাড়ি জব্দের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
পরিবহন সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নগরীতে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ লেগুনা পরিচালনা করছে। তাদের দাবি, নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে কিছু গাড়িকে কথিত ‘টোকেন’ দেওয়া হয়, যা দেখিয়ে তারা নির্বিঘ্নে বিভিন্ন চেকপোস্ট ও ট্রাফিক তল্লাশি অতিক্রম করে। যদিও এ ধরনের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বৈধতার বেড়াজাল, অবৈধতার উৎসব
একটি বৈধ যানবাহন সড়কে নামাতে মালিককে ড্রাইভিং লাইসেন্স, রেজিস্ট্রেশন, রুট পারমিট, ফিটনেস সার্টিফিকেট, ট্যাক্স টোকেন, বীমা, পরিবেশগত ছাড়পত্রসহ একাধিক আইনি শর্ত পূরণ করতে হয়। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, এসব শর্তের কোনোটি পূরণ না করেও অসংখ্য লক্কড়ঝক্কড় লেগুনা বছরের পর বছর প্রকাশ্যে চলাচল করছে।
পরিবহন ব্যবসায়ীরা বলছেন, নিয়ম মেনে ব্যবসা করতে গিয়ে তারা যেমন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি অবৈধ যানবাহনের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতায়ও টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।
রাজপথ দখল করে অবৈধ স্ট্যান্ড
সরেজমিনে দেখা যায়, নগরীর জেলরোড, ওসমানী উদ্যান সংলগ্ন এলাকা, কোর্ট পয়েন্ট, বটেশ্বর বাজার, পীরের বাজার, জিন্দাবাজার ও টিলাগড় পয়েন্টসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে অবৈধ লেগুনা স্ট্যান্ড। অনেক স্থানে যানবাহন পার্কিং নিষিদ্ধ থাকলেও সেসব এলাকাতেই সারি সারি লেগুনা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
এতে একদিকে যেমন যানজট তীব্র আকার ধারণ করছে, অন্যদিকে পথচারীদের চলাচলও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
রশিদে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, ‘সিলেট জেলা হিউম্যান হলার চালক শ্রমিক ইউনিয়ন’-এর নামে প্রকাশ্যে ছাপানো রশিদ ব্যবহার করে প্রতিটি লেগুনা থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। তবে চালকদের অভিযোগ, এই অর্থের বিনিময়ে তারা কোনো ধরনের নিরাপত্তা, বীমা কিংবা শ্রমিক কল্যাণ সুবিধা পান না।
পরিবহন সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই চাঁদাবাজি বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় সিন্ডিকেট আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
তামাবিল মহাসড়কে ঝুঁকির আরেক নাম লেগুনা
জৈন্তাপুর-টিলাগড়-বন্দরবাজার রুটে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক লেগুনা চলাচল করে। যাত্রী তুলতে একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে অনেক চালক বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালান। হঠাৎ থামানো, উল্টো দিক দিয়ে চলা এবং যেখানে-সেখানে যাত্রী ওঠানামা করানোর কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এই রুটে প্রতিদিনই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। অনেক সময় অল্পের জন্য বড় ধরনের প্রাণহানিও এড়ানো যাচ্ছে।
শিশু ও অদক্ষ চালকদের হাতে স্টিয়ারিং
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে, অভিযোগ অনুযায়ী অনেক লেগুনাই চালাচ্ছেন লাইসেন্সবিহীন কিশোর কিংবা অনভিজ্ঞ চালক। অতিরিক্ত যাত্রী বহন, ফিটনেসবিহীন গাড়ি এবং বেপরোয়া গতির কারণে এসব যান চলাচল সাধারণ মানুষের জীবনের জন্য বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।
সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের মতে, দক্ষ চালক ও নিরাপদ যানবাহন নিশ্চিত করা না গেলে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব নয়।
দুই বছরে প্রাণহানি ৭৩৯
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে সিলেট বিভাগে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭৩৯ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব দুর্ঘটনার বড় একটি অংশের সঙ্গে ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অতিরিক্ত গতি এবং অনভিজ্ঞ চালকদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
বিআরটিএর তথ্য বনাম বাস্তবতা
বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, সিলেট নগরীতে নিবন্ধিত বৈধ লেগুনার সংখ্যা ২,১০৪টি। তবে নগরীর বিভিন্ন সড়কে চলাচলকারী লেগুনার সংখ্যা এই হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি বলে দাবি করছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগ রয়েছে, নিয়মিত অভিযান, মামলা ও গাড়ি জব্দের কথা বলা হলেও বাস্তবে অবৈধ পরিবহন নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান অগ্রগতি খুব কম।
বৈধ ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ
বৈধ পরিবহন মালিকদের অভিযোগ, তারা নিয়ম মেনে সরকারের রাজস্ব প্রদান করেও নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। অন্যদিকে অবৈধ যানবাহন নির্বিঘ্নে চলাচল করায় বৈধ ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তাদের ভাষ্য, আইন যদি সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ না হয়, তাহলে বৈধ ব্যবসায় নিরুৎসাহিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
উত্তর চায় নগরবাসী
প্রশ্ন উঠছে যদি নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হয়, তাহলে বছরের পর বছর ধরে কীভাবে অবৈধ স্ট্যান্ডগুলো বহাল থাকে? কীভাবে প্রকাশ্যে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ থাকলেও তা বন্ধ হচ্ছে না? কারা এই সিন্ডিকেটকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে? সড়কে প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্বই বা কে নেবে?
নগরবাসীর দাবি, অবৈধ লেগুনা, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব এবং সড়কে অনিয়মের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ও কার্যকর অভিযান পরিচালনা করতে হবে। একই সঙ্গে অভিযোগগুলোর বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
Leave a Reply